হ্যারিকেন লাইট।

ফাইল চিত্র,

হ্যারিকেন লাইট

দেবু হঠাৎ বললো – কাকু, নতুন একটা গল্প বলো। আমি ওদের বললাম; কি শুনতে চাস, বল। রিঙ্কি, পিঙ্কি, সাগর, সনুরা বললো – ভূত-ফুতের বা রাক্ষস খোক্ষস এর গল্প নয়। ওগুলো ওদের অনেক শুনিয়েছি। গতকাল থেকে কালবৈশাখীর মহাতান্ডবে ইলেট্রিক লাইনে গাছ পড়ে গেছে আর দু’একটা লাইট পোস্টও পড়ে গেছে। তাই আজ ইলেক্ট্রিকের আলো আসবে না। অন্ধকারে ভূত- ফুতের গল্পে ওরা ভয় করবে। বললাম; ঠিক আছে, শোন তাহলে। সবাই লকডাউনের নিস্তব্ধ সন্ধ্যার অন্ধকারে পড়ালেখা’র বইগুলো টেবিলে গুছিয়ে রেখে, শোনার আগ্রহে চুপটি করে বসে রইলো। শুরু করলাম;

সে অনেক বছর পূর্বের কথা। যখন ইলেকট্রিক আলো তো দূর, পাড়াগাঁয়ে ডায়নামো পর্যন্ত ছিল না। পুজো, পার্বণ, মেলা, সামাজিক অনুষ্ঠান – বিবাহ, অন্নপ্রাশন, সাধভক্ষণ, যাত্রা পালাগান কিংবা বিদ্যালয়ের কোনো অনুষ্ঠান এমনকি রাতের বেলা গ্রামের বিচারসভায় আলোকিত করার জন্য – “হ্যাজাক লাইট” বা “ডে-লাইট” জ্বেলে আলোর ব্যবস্থা বা রোশনাই করেই অনুষ্ঠান সু-সম্পন্ন করা হতো। সেসব “উজ্জ্বল আলোর বাতি” এবং “ঝাড়বাতি” সবার বাড়িতে থাকতো না। গ্রামের কিছু বর্ধিষ্ণু পরিবার কিংবা প্রত্যেক জমিদার বাড়িতে থাকতো।

গ্রামের মোড়লদের মধ্যে কয়েকজনের বাড়িতে ঐসব “বাতি আলো” থাকতো। এর সঙ্গে উনারা লোহার তৈরী – “দশ নম্বরী” বা বিশ নম্বরী কড়াই” ও রাখতেন। অনুষ্ঠানের প্রয়োজনে ওগুলো ভাড়ায় পাওয়া যেত। বর্তমানে ডেকোরেটার্স বা টেন্ট হাউস থেকে যেমন অনুষ্ঠানের প্রয়োজনে ভাড়ায় নিয়ে আসা হয়, তেমনি ওইসময় যাঁদের প্রয়োজন, তাঁরা অগ্রিম আবেদনের ভিত্তিতে ভাড়ায় নিয়ে এসে নিজেদের অনুষ্ঠানে আলোকিত করতেন। “হ্যারিকেন লাইট” বা “ডে-লাইট” এর জ্বালানি হিসেবে কেরোসিন তেল (মাটির তেল) ব্যবহার করা হতো। আমাদের গ্রামের – গোবর্দ্ধনবাবু, সন্তোষবাবু, অবিনাশবাবু, অতুলবাবু, বঙ্কিমবাবু, কুমেদবাবু, কার্তিকবাবু, সুবোধবাবু, অরবিন্দবাবু, হিমাংশুবাবুদের বাড়ি থেকে এনে যেকোনো অনুষ্ঠানের প্রয়োজনে ব্যবহার করা হতো। কেউ কেউ ভাড়া নিতেন, তবে সবাই ভাড়া নিতেন না।

সেই সময় সামাজিক যাত্রাপালাগানের থেকে বেশি হতো – পৌরাণিক পালাগান। রামায়ণ ও মহাভারত এর বহু কাহিনী, ঐতিহাসিক পালাগান / সুলতানি আমলের – হুমায়ুন, সিরাজউদ্দৌলা, বখতিয়ার খিলজি, রিজিয়া সুলতানা, শেরশাহ, পৃথ্বীরাজ-সংযুক্তা’র কাহিনী, রাণী লক্ষ্মীবাঈ, শিবাজী কিংবা স্বাধীনতা আন্দোলনে সংগ্রামীদের ভূমিকা এবং বীরত্বের কাহিনী, কপালকুণ্ডলা আর ছিল কেষ্টযাত্রা, লালচাঁদ চুরি, মনসামঙ্গল এর চাঁদ সওদাগর, শীতলামঙ্গল এর বিভিন্ন কাহিনী অবলম্বনে যাত্রা পালাগান। সেইসময়কালে সিনেমা কিংবা টিভির এতো প্রচলন ছিলো না। তাই মনোরঞ্জনের জন্য লোকে দূর দূরান্ত গ্রামে গিয়েও – এইসব অনুষ্ঠান দেখতে যেত।

এখন যেটি বলছি, তা বছর চল্লিশেক পূর্বে একরাতে যাত্রাপালাগান শুরু হয়েছে, উত্তরপল্লীর মনসাপূজা উপলক্ষ্যে। চলছে মহাভারতের কাহিনী অবলম্বনে – “কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ”। অনুষ্ঠান মঞ্চের সামনের দুই খুঁটিতে দুটি “হ্যাজাক লাইট” ঝুলছে। যাত্রামঞ্চের সামনে দর্শকমন্ডলী ভরপুর, অধীর আগ্রহে দেখছেন। শিল্পীদের মধ্যে তদানীন্তন কালের যাত্রামঞ্চের নামকরা দক্ষ অভিনেতা উপস্থিত ছিলেন – সরোজবাবু, পুর্ণেন্দুবাবু, বীরেনবাবু, সুনীলবাবু, সত্যবাবু, সুকুমারবাবু, জয়ন্তবাবু, পঞ্চাননবাবু, নরেনবাবু আর বাদলবাবুরা৷ এনারা ছিলেন পালাগানের অভিনয়ে। অনেকক্ষণ শুরু হয়েছে। এক সময় – দুর্যোধন আর ভীমের লড়াই শুরু হয়েছে। দু’জনেই গদা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে হম্বিতম্বি হুঙ্কারসহ লড়েই যাচ্ছে৷ গদার লড়াই কেউ থামাচ্ছে না। একটা নির্দিষ্ট সময়ের পর যাত্রাপালার প্রম্পটার মহাশয়” মনীদাসবাবু” এবং নির্দেশক মহাশয় “অশ্বিনীবাবু” – ওদের – দু’জনকে বলছেন; পচা (দুর্যোধন), গদা ফেলে দে, হেরে যা, মাটিতে পড়ে যা, গড়াগড়ি খা ! পঞ্চানন (দুর্যোধন ওরফে পচা) মোটেই শুনছে না কারুর কথা। গদা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে নাড়ু (ভীম ওরফে নরেন)কে মাটিতে ফেলে মেরেই যাচ্ছে। মাটি থেকে উঠে ভীম আবার শুরু করে দিয়েছে গদার খেলা। কেউ হারছে না। দর্শকমন্ডলী মজা পেয়ে হাততালি দিচ্ছে৷ সামনে ওদের বৌ’রা রয়েছে। দুর্যোধন বাড়িতে বৌকে বলে এসেছিল – আজ নাড়ুকে ভীষণ ধোলাই দেব, ভালো করে আমার অভিনয়টা দেখে আসবে চলো; “ও শালা !রি-হিয়ার্শালের প্রত্যেকটাদিন আমায় মাটিতে গড়িয়ে গড়িয়ে মারতো। আজ শালাকে দেখাবো ওর বৌয়ের সামনে; কার জোর বেশি।” যাত্রাপালাগানের তিনচার দিন পূর্বে নরেন লোভের বশবর্তী হয়ে – এক বালতি ডাল খেয়ে ফেলায়, গত পরশু থেকে ওর ওলাউঠা’র দশায় ভুগেছিল। তাই দশাসই চেহারা সত্বেও নরেন (ভীম) এর শরীরে সেদিনও স্বাভাবিকভাবে একটু কমজোরি ছিল।

ভীম একটু সামলানোর পর আবার উঠে গদার প্রহার করতে চাইলো। গদা ঘোরাতে গিয়ে মঞ্চের সামনে ঝোলানো “হ্যারিকেন লাইট”টির উপর পড়লো, একটা মস্ত জোরে ঘা। বাতি ছিটকে পড়ে নিভে গেলো। দুর্যোধন ভাবলো – ভীম একটা আলো ভেঙে দিয়েছে আর আমি যদি অন্য বাতিটা ভাঙতে না পারি – বাড়িতে বৌ আমায় বকবে। সেও গদা ঘুরিয়ে অন্য লাইটটি ভেঙে দিলো। চারিদিকে ঘুরঘুট্টি অন্ধকার – পালাও পালাও চিৎকার! সব ভণ্ডুল হয়ে গেল৷

পিঙ্কিরা বললো; ভন্ডুল ! সেটি আবার কী?
আজ যেমন তোমরা – আলোর অভাবে নিজেদের পড়ালেখা ভণ্ডুল করলে ! সেই রকম। আর কি !

ওরা সবাই হি হি হি করে হেসে ফেললো ৷

✍️ সমরেশ সুবোধ পড়িয়া

আপনিও পাঠাতে পারেন আপনার এলাকার তথ্য, আপনার লেখা ছড়া, কবিতা, ছোটগল্প বা আপনার আঁকা ছবি।
আমরা বিচার বিশ্লেষণ করে শর্তসাপেক্ষে তা সর্বসমক্ষে প্রকাশ করব, আপনাদের প্রিয় এই ওয়েবসাইটে
আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে সংযুক্ত হতে চাইলে এই লেখার উপর ক্লিক করুন 👈

Social Share

অনুসন্ধান !!

এখনকার খবর !!

3 thoughts on “হ্যারিকেন লাইট।”

  1. Biswajit Mahato

    এই রাতে হাকলা বৃষ্টির পরে লেখাটা পড়তে দারুন লাগলো

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *